একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নিজেকে সুন্দরভাবে পরিচয় করানোর প্রথম সুযোগ হচ্ছে বায়োডাটা (Biodata)। কিন্তু এই বায়োডাটা সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারার ব্যর্থতায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি চাকরি প্রাপ্ত হন না। তাই বুঝতেই পারছেন, বায়োডাটা লেখার নিয়ম অনুসরণ করে বায়োডাটা বা জীবনবৃত্তান্ত সঠিকভাবে প্রস্তুত করা কতটা জরুরি।
বায়োডাটা, রেজুমে এবং সিভি
বায়োডাটা (Biodata) শব্দের অর্থ জীবন বৃত্তান্ত। বায়োডাটা শব্দটির পরিবর্তে রেজুমে (Resume) এবং সিভি (CV) অর্থাৎ কারিকুলাম ভিটা (Curriculum Vitae) দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়।
সিভির পরিবর্তে রেজুমে শব্দটি প্রয়োগ করা হলেও কারিকুলাম ভিটা কিন্তু প্রায়োগিক অর্থে রেজুমে বা সিভি নয়। যদিও সিভি এবং রেজুমে শব্দ দুটি একই উদ্দেশ্য সাধন করে, দুটোই নিয়োগকর্তার কাছে একজন আদর্শ প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।
এদের পার্থক্য মূলত গঠন, বিবরণ, দৈর্ঘ্য এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
নিম্নে বায়োডাটা লেখার নিয়ম বা বায়োডাটায় কি কি বিষয় থাকলে আকর্ষণীয় হবে সেগুলো আলোচনা করা হল।
১. শিরোনাম (Title)
বায়োডাটার নিয়মে title বলতে একদম শুরুর অংশকে বোঝায়, যেখানে চাকরিপ্রার্থীর সম্পূর্ণ নাম বোল্ড (bold) করে উল্লেখ করতে হবে। তারপর ঠিকানা দিতে হবে। বায়োডাটায় এমন ঠিকানা দিতে হবে যেখানে চিঠি দিলে আপনি সেটা পাবেন। এর সাথে দিতে হবে আপনার মোবাইল নাম্বার এবং ই-মেইল এড্রেস।
এই অংশটি বায়োডাটায় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তাই এটি সঠিকভাবে লিখতে হবে।
২. পেশাগত লক্ষ্য (Career Objective)
এই অংশে আপনি কোম্পানিকে কি দিতে পারবেন সেটার উপর গুরুত্ব আরোপ করে লিখতে হবে।
আপনি কোম্পানি থেকে কি আশা করেন তার ওপর নয়।
একক্ষেত্রে বর্তমান চাকরি নিয়ে আপনার লক্ষ্য এবং কোম্পানিকে আপনি আপনার দক্ষতার মাধ্যমে কি দিতে পারবেন সেটা লিখতে হবে। এইভাবে লিখতে পারেন:
Dedicated to work in a challenging and competitive environment in an organization where I will be entrusted with greater responsibility and strategic decision making authority, self-driven and highly motivated.
এই অংশে ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার লক্ষ্য, আপনার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরবেন।
৩. বিশেষ যোগ্যতা (Special Qualification)
বিশেষ যোগ্যতা বা অতিরিক্ত যোগ্যতা – এই অংশে শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া আপনার অন্যান্য যোগ্যতাসমূহ উল্লেখ করতে হবে।
বিশেষ যোগ্যতা চাকরি পাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে থাকে। অতিরিক্ত যোগ্যতায় যদি আপনি তেমন বেশি পারদর্শী না হন, নতুন হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে এই অংশ শিক্ষাগত যোগ্যতার পরে দিয়ে দিতে পারেন।
বিশেষ যোগ্যতা গুলো এমন হয়ে থাকে যেমন:
- Computer Skill
- Universal Testing Machine
- ERP Software Operating
ইত্যাদি – যে কাজ গুলো আপনি ভালো জানেন বা যেগুলোতে আপনি পারদর্শী মনে করেন।
৪. কর্মসংস্থান ইতিহাস (Employment History)
কর্মসংস্থান ইতিহাস হলো পূর্ববর্তী কাজের বিস্তারিত বর্ণনা।
চাকরিতে যোগদান করার পর বর্তমান সময় পর্যন্ত আপনি কোন কোন কোম্পানিতে কাজ করেছেন, সেই কর্মস্থানে আপনার পজিশন কি ছিল, ও কোন কোম্পানিতে কত বছর কাজ করেছেন – এই সমস্ত কিছু বিস্তারিত লিখতে হবে।
অনেক সময় দেখা যায়, যাদের অভিজ্ঞতা বেশি, তারাই ইন্টারভিউ এর জন্য ডাক পান।
৫. শিক্ষাগত যোগ্যতা (Academic Qualification)
এই অংশে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে।
ডিগ্রির নাম, ফলাফল, প্রতিষ্ঠান, সময়কাল সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখতে হবে।
নিচে উল্লিখিত নিয়মানুসারে তথ্য প্রদান করতে পারেন:
- ডিগ্রির নাম (যেমন: SSC, HSC, BCom)
- কোর্স সময়কাল (কবে থেকে কবে)
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বোর্ডের নাম
- পরীক্ষার বছর এবং প্রয়োজনে ফলাফল প্রকাশের সময়
- ফলাফল/Result এবং যদি উল্লেখযোগ্য সাফল্য (যেমন: মেধাতালিকায় স্থান) থাকে তবে তার উল্লেখ করতে হবে
নোট:
- কোন ডিগ্রির ফলাফল এখনও প্রকাশ না হয়ে থাকলে সেই ডিগ্রির পাশে (Appeared) উল্লেখ করতে হবে
- কোন কোর্সে অধ্যয়নরত থাকলে (Ongoing) লিখতে হবে
- যদি ফলাফল খারাপ হয়, তাহলে সেটা উল্লেখ না করাই ভালো
- একটি ডিগ্রির ফলাফল উল্লেখ করে আরেকটি বাদ দিলে দৃষ্টিকটু দেখায়
৬. প্রশিক্ষণ (Training)
যে সকল বিষয় বা কাজে আপনি ট্রেইনিংপ্রাপ্ত, সেগুলো বায়োডাটায় সুন্দরভাবে উল্লেখ করতে পারেন। কারণ নিয়োগকর্তা অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগ দিতে চান।
তাই তার কাছে আপনাকে অভিজ্ঞ হিসেবে প্রমাণ করতে প্রশিক্ষণের তথ্য উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. চাকরির অভিজ্ঞতা (Experience)
এই অংশটিতে আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা উল্লেখ করতে পারেন।
আপনি পূর্বে কোথায় কাজ করেছেন, সেটি সংক্ষিপ্ত আকারে লিখবেন।
৪-৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে এই অংশটি ৫-৬ লাইনের মধ্যে শেষ করতে পারেন।
কোম্পানি অভিজ্ঞতা চাইলে অবশ্যই এই অংশটি দিতে হবে।
৮. ভাষাগত দক্ষতা (Language Proficiency)
কোন কোন ভাষায় আপনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে ও লিখতে পারেন, সেটি এখানে উল্লেখ করুন।
ভাষাগত দক্ষতা আপনাকে একধাপ এগিয়ে রাখতে পারে।
তাই সংক্ষেপে আপনার ভাষাজ্ঞান তুলে ধরুন।
৯. ব্যক্তিগত তথ্য (Personal Information)
ব্যক্তিগত তথ্য বলতে নিজের সম্পর্কে মৌলিক তথ্য বোঝায়।
এই অংশে নিচের বিষয়গুলো উল্লেখ করা যেতে পারে:
- Father’s Name
- Mother’s Name
- Date of Birth
- Gender
- Marital Status
- Nationality
- National Id No.
- Religion
- Present Address
- Permanent Address
- Current location
এছাড়াও আপনি কোন দেশ ভ্রমণ করেছেন, শখ ইত্যাদিও এখানে উল্লেখ করা যায়।
১০. রেফারেন্স (Reference)
বায়োডাটা বা জীবনবৃত্তান্তের শেষ অংশে রেফারেন্স দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, রেফারেন্স হিসেবে আত্মীয়দের নাম না দিয়ে আপনার শিক্ষক বা কর্মস্থলের সিনিয়রের নাম দেওয়া উত্তম।
সাধারণত রেফারেন্স হিসাবে সর্বোচ্চ ২-৩ জনের নাম উল্লেখ করাই শ্রেয়।
যার নাম দিবেন, তার কাছ থেকে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে।
রেফারেন্সে যা যা লেখা যেতে পারে:
- Name
- Organization
- Designation
- Address
- Phone No
১১. ছবি যুক্ত করা
বায়োডাটায় আপনি যে ছবি ব্যবহার করবেন সেটি অবশ্যই সদ্য তোলা হতে হবে যেন আপনার চেহারা ভালো করে বোঝা যায়।
ছবিটি ভালো করে তুলতে হবে, কেননা ভালো ছবি আপনার উত্তম মন-মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
১২. স্বাক্ষর ও তারিখ
সর্বশেষ অংশে নিজের নামের ওপরে স্পষ্ট করে Signature (স্বাক্ষর) এবং তারিখ দিতে হবে।
উপরের সবগুলো ধাপ ঠিকমতো ফিলআপ করলে আপনার একটি পরিপূর্ণ বায়োডাটা বা সিভি রেডি হয়ে যাবে।
সিভি (CV) এবং রেজুমে – গঠনগত পার্থক্য
সিভি (CV) এবং রিজুমে প্রায় এক জিনিস হলেও গঠনগত দিক থেকে কিছু পার্থক্য রয়েছে:
- সাধারণত সিভি ২-৩ পাতার হয়
- রিজুমে সবসময় এক পাতার হয়ে থাকে
- সিভিতে বিষয়ের ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দেওয়া হয়
- রিজুমেতে তথ্য খুব সংক্ষেপে লেখা হয়
- রিজুমেতে ডিজাইন এ্যাডভান্স লেভেলের হয়
- সিভিতে তথ্য উপস্থাপন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে সিভি (CV) ও Resume একই অর্থে ব্যবহার হয়।
বায়োডাটা বা সিভি লেখার সময় কিছু বর্জনীয় বিষয়:
- নিজের নাম সার্টিফিকেট অনুযায়ী লিখুন
- ডাক নাম বা Mr./Mrs. লেখার প্রয়োজন নেই
- জন্ম তারিখ সার্টিফিকেট অনুযায়ী দিন
- ঠিকানা সঠিক ও পরিপূর্ণভাবে লিখুন
- একাধিক মোবাইল নাম্বার দিন, প্রফেশনাল ইমেইল ব্যবহার করুন
- ব্যক্তিগত তথ্য যেমন বিবাহ, ছেলে-মেয়ে এড়িয়ে চলুন
- চশমা ছাড়া সদ্য তোলা রঙিন ছবি ব্যবহার করুন
- CV যেন দুই পৃষ্ঠার বেশি না হয়
- ভুল বানান ও ভাষাগত ভুল পরিহার করুন
- কোনও মিথ্যা তথ্য দেবেন না
কোথায় বায়োডাটা লিখবেন?
বায়োডাটা বিভিন্নভাবে লিখতে পারেন:
- নিজে হাতে বা Microsoft Word-এ কম্পিউটারে
- অনলাইনে বায়োডাটা লেখার বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে
- মোবাইল অ্যাপে সহজেই তৈরি করতে পারেন
যেভাবেই লিখুন না কেন, বায়োডাটা লেখার নিয়ম অনুসরণ করে নির্ভুলভাবে লিখতে হবে।